আমরা যখন ‘সাহিত্য’ শব্দটা শুনি, প্রথমেই কী চোখে ভাসে?
হয়তো বই, হয়তো কবিতা, কিংবা কোনো পুরোনো উপন্যাসের পাতা। কিন্তু সাহিত্য আসলে এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু।
সাহিত্য কী?
সহজ ভাষায় বললে, সাহিত্য হলো জীবনের শিল্পিত প্রকাশ।
মানুষের জীবনের ঘটনা, অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও অনুভূতি যখন একজন লেখকের কল্পনা, শিল্পবোধ ও নান্দনিক ভাষার মাধ্যমে বিশেষ রূপ লাভ করে, তখন তা সাহিত্য হয়ে ওঠে।
তবে সাহিত্য আর ইতিহাস এক বিষয় নয়।
ইতিহাসে অতীতের ঘটনা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ ও বর্ণনা করা হয়। অন্যদিকে সাহিত্যে শুধু ঘটনার বর্ণনাই থাকে না; লেখকের কল্পনা, অনুভূতি, চিন্তা ও শিল্পবোধের মধ্য দিয়ে সেই ঘটনা বা অভিজ্ঞতা নতুন এক রূপ লাভ করতে পারে।
সাহিত্য যেন এক আয়না—যেখানে আমরা আমাদের জীবনকেই দেখতে পাই, তবে আরও গভীরভাবে, মানবিক অনুভূতি ও শিল্পের আলোয়।
সাহিত্যের পরিচয় তো জানা হলো। কিন্তু একটি সাহিত্যকর্ম গড়ে উঠতে কী কী দরকার?
এবার সেগুলো বোঝার চেষ্টা করি।
১. সাহিত্যের উপকরণ
প্রথমেই দরকার উপকরণ।
মনে করো, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কথা। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে সংঘটিত সেই আন্দোলন এবং একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে অসংখ্য গান, কবিতা, গল্প, নাটকসহ বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে।
এসব সাহিত্যকর্মের কথা বিবেচনা করলে ভাষা আন্দোলনের ঘটনা এবং এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের অভিজ্ঞতা হচ্ছে সাহিত্যের উপকরণ।
অর্থাৎ, সাহিত্যিক যে ঘটনা, অভিজ্ঞতা, মানুষ, সমাজ বা জীবনবাস্তবতাকে অবলম্বন করে সাহিত্য রচনা করেন, সেটিই তাঁর সাহিত্যের উপকরণ।
২. সাহিত্যের বিষয়বস্তু
এবার একটি গানের কথা মনে করি—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’।
এই গানে কী প্রকাশ করা হয়েছে?
এখানে ভাষা আন্দোলন ও ভাষাশহীদদের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি শোক ও শ্রদ্ধা এবং তাঁদের কখনো ভুলে না যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশ পেয়েছে।
এখানে ভাষা আন্দোলনের ঘটনা যদি সাহিত্যের উপকরণ হয়, তাহলে সেই ঘটনার মধ্য দিয়ে যে ভাব, বক্তব্য বা উপলব্ধি প্রকাশ করা হচ্ছে, সেটিই সাহিত্যের বিষয়বস্তু।
তাহলে উপকরণ আর বিষয়বস্তুর পার্থক্যটা খুব সহজ—
কী নিয়ে লেখা হচ্ছে = উপকরণ
তার মধ্য দিয়ে কী বলা হচ্ছে = বিষয়বস্তু
৩. সাহিত্যের আঙ্গিক বা শিল্পরূপ
এবার আবার ভাষা আন্দোলনের কথাই ভাবো।
ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কেউ কবিতা লিখতে পারেন, কেউ গল্প, কেউ নাটক, আবার কেউ উপন্যাস।
অর্থাৎ, একই বা কাছাকাছি উপকরণকে বিভিন্ন সাহিত্যিক বিভিন্ন রূপে প্রকাশ করতে পারেন। লেখক তাঁর বক্তব্যকে যে বিশেষ সাহিত্যিক রূপে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেন, সেটিই হচ্ছে সাহিত্যের আঙ্গিক বা শিল্পরূপ।
গল্প, কবিতা, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ ইত্যাদি সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিক বা শিল্পরূপ।
একসঙ্গে মনে রাখি
এবার পুরো বিষয়টা একসঙ্গে চিন্তা করি।
একজন সাহিত্যিক কী নিয়ে লিখছেন, সেটা তাঁর সাহিত্যের উপকরণ।
সেই উপকরণের মধ্য দিয়ে তিনি কী বলতে চাইছেন, সেটা বিষয়বস্তু।
আর সেই কথাটি তিনি কোন সাহিত্যিক রূপে প্রকাশ করছেন, সেটা আঙ্গিক বা শিল্পরূপ।
খুব সহজ করে বললে—
কী নিয়ে লেখা হচ্ছে → উপকরণ
কী বলা হচ্ছে → বিষয়বস্তু
কোন রূপে বলা হচ্ছে → আঙ্গিক বা শিল্পরূপ
এই তিনটি বিষয় বুঝতে পারলে একটি সাহিত্যকর্মকে শুধু পড়াই নয়, তার ভেতরের গঠন ও বক্তব্যকেও আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব।