আমরা যখন একজন শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিব, তখন আমাদের উপর এটা আবশ্যক যে, আমরা তার জন্য যতটা পারি ভালো কিছু চাইব। একজন পরিচালক তার প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে ভালো যেটার ব্যবস্থা করতে পারেন, সেটা হলো থাকা-খাওয়ার সুন্দর ব্যবস্থা করা এবং ভালো টিচারের ব্যবস্থা করা।
ভালো শিক্ষকের মাপকাঠি
এখন ভালো টিচার কে? নরমালি বলা হয়, যে ভালো পড়ায়, সে ভালো টিচার। এটার বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাওয়া যায়, কিন্তু সেটা এই মুহূর্তে আমার আলোচনার বিষয় না।
আমার দৃষ্টিতে ভালো টিচারের আরও কিছু শর্ত আছে। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটা হলো শুদ্ধ ভাষাভাষী হওয়া। এই যোগ্যতাটা পুরোপুরি নেই বলে নিজেকে এখনো ভালো টিচার মনে করতে পারি না।
ভাষা হারানোর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
আব্বু যখন জামিয়া মোহাম্মাদিয়ায় পড়াতেন, তখন মোহাম্মদপুরের একটা বাসায় ভাড়া থাকতাম। আম্মু বলেন, প্রতিবেশিদের ভাষা এত সুন্দর ছিল যে, তাদের কথা শুনে আমার কথাও অনেক সুন্দর হয়ে যায়। ছোট্ট আমার কথা সবাই অনেক পছন্দ করত। কিন্তু এখন? এখন আমার নিজের আওয়াজ শুনলে নিজেরই খারাপ লাগে। চাই কোকিলের মতো কথা বলতে আর শোনায় যেন কাকের মতো।
কিন্তু শুদ্ধ স্বরটা হারালাম কীভাবে? মাদরাসায় এসে। মাদরাসায় আরও দশ জেলা থেকে দশ রকমের ছাত্র এসেছিল। একেক জনের ভাষা একেক রকম। যেহেতু আবাসিক ছিলাম, সবার সাথে মিশতে খুব দ্রুতই নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম।
এর জন্য যে আমি মাদরাসাকে দায়ী করব, এমনও সুযোগ নেই। কারণ, বাংলাদেশে খুব কম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমন আছে যেখানে ভাষার শুদ্ধতার প্রতি জোর দেওয়া হয়। দেখা যাবে, যিনি বাংলা বর্ণমালা পড়াচ্ছেন, তিনি নিজেই শুদ্ধভাবে বাংলা উচ্চারণ করতে পারেন না। আরেকজন ইংরেজি বর্ণমালা পড়াচ্ছেন ‘ডাব্লিউ’ বলে।
নূরানী প্রশিক্ষণ ও আমাদের বাস্তবতা
এখন সরকারের কাজ হলো স্কুল দেখা, আলিয়া মাদরাসা দেখা। কিন্তু কওমী নিয়ে সরকারের দেখার সুযোগ বা সময় নেই। অথচ কওমী টিচারদের আরবি উচ্চারণে দক্ষতার মতো বাংলা ও ইংরেজি দক্ষতাটাও জরুরি ছিল। যেহেতু বাচ্চারা তাদের কাছে শিখছে, তাদের উচ্চারণ অবশ্যই শুদ্ধ হওয়া উচিত। সেই সাথে মাদরাসায় যদি শুদ্ধ ভাষা আবশ্যক করতে হয়, টিচারের সেটাতে অভ্যস্ত হওয়ার কোনো বিকল্প আছে বলে আমি মনে করি না।
এখন আমাদের বাচ্চাদের জন্য টিচার তৈরির নূরানী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো, তারা কি আমাদের এই চাহিদা পূরণ করছে? বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বলি যে, পূরণ করছে না। কারণ, উপরের লেভেলের টিচার হিসেবে শুদ্ধ ভাষাভাষী অনেককে পেলেও নিচের লেভেল মানে নূরানীর জন্য এমন টিচার পাওয়া অনেক কঠিন।
অন্যান্য দক্ষতার অভাব
এটা গেল একটা বিষয়, যেটা আমাদের বর্তমানে প্রয়োজন কিন্তু নেই। তারপর বলি যে, অনেক টিচার চান টুকিটাকি কম্পিউটারের কাজ শিখতে, ইংরেজির ভয় দূর করতে। আমাদের কোনো বোর্ড এগুলো নিয়ে কী করছে, কেউ আমাকে জানাতে পারবেন?
মরহুম আব্দুল জব্বার জাহানাবাদী (রহ.) যখন বেফাকে ছিলেন, তখন শূন্য থেকে দৃশ্যমান অনেক কাজ হয়েছিল মাদরাসায় সাধারণ শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে। তারপর কতদূর কী হয়েছে এতদিনে? প্রশ্নগুলো কি কাউকে করা যাবে?
কওমির সন্তানদের জন্য আমার স্বপ্ন
দাওরা হাদীস শেষ করার আগে মামা বলেছিলেন তার কোচিংয়ে গণিত পড়াতে। কয়েকদিন যাবত মামা বলে যাচ্ছেন, তার সাথে মিলে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রির নোট লেখায় সাহায্য করতে। (ইন্টার পর্যন্ত আমি বিজ্ঞান বিভাগে পড়েছিলাম।) মামা দেশসেরা টিচার, বর্তমানে স্কুলের বই লেখার দায়িত্বে রয়েছেন। গণিতের কোচিং করালে কিংবা স্কুলের নোট লিখলে টাকা-পয়সা, খ্যাতির হয়তো অভাব হতো না।
কিন্তু আমি কওমির সন্তান। দেশে শান্তির পরে যদি কিছু চেয়ে থাকি, তাহলে সেটা শুধুমাত্র কওমির সন্তানদের ভালো চাওয়া। তাদেরকে মূল ধারায় দেখা কিংবা তাদের জীবনমানের উন্নয়ন দেখা। মর্যাদার সাথে বাঁচতে দেখা। এটি একটি তীব্র, দীর্ঘ, ক্লান্তিকর লড়াই। জানি না, কত দিন এই লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারব!