এই বিজ্ঞাপনটা ২০১৩ সালের। ছাপা হয়েছিল সেই সময়কার বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে।

ঘটনা কী?
ঘটনাটি ছিল এমন: শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে একদল ব্যক্তি জামায়াতে ইসলামী দ্বারা পরিচালিত এবং তাদের মালিকানাধীন বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকায় হুট করেই যুক্ত হয়ে যায় গ্রীন লাইন পরিবহনের নাম। তখন গ্রীন লাইন পরিবহনের পক্ষ থেকে এই জরুরি বিজ্ঞাপনটি ছাপিয়ে দাবি করা হয় যে, তারা তো জামায়াতে ইসলামীর সাথে সম্পর্কিত ননই, বরং তাদের মালিক জনাব মোঃ আলাউদ্দিন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। শুধু তাই নয়, তিনি মানবতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে শাহবাগে চলমান গণআন্দোলনেরও একজন সমর্থক।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এত ঘটা করে এই বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রয়োজনিয়তা কেন অনুভব করেছিল গ্রীন লাইন পরিবহন কর্তৃপক্ষ?
কী ছিল এই বিজ্ঞাপনের পিছনে?
তখন বিভিন্ন বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে ‘জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে চিহ্নিত করার পর সেগুলো বয়কটের ডাক দেওয়া হচ্ছিল।
বয়কটের ডাক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তখন খুব বড় কোনো ভয়ের বিষয় ছিল না। আর যদি থাকতো তবু শাহবাগের জনপ্রিয়তা এমন ছিল না যে, তারা বয়কট পুরোপুরি কার্যকর করাতে পারবে। কিন্তু বয়কটের এই ডাক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর। একবার যদি কোনো প্রতিষ্ঠানকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লেবেল দেওয়া হয়ে যায়, তাহলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
চেতনা ব্যবসায়ীদের ধান্দাবাজি
মূল সমস্যাটি আরও গভীর ছিল। বয়কটের লিস্ট নিয়ে সেই সময় রীতিমতো এক রমরমা ব্যবসা চলছিল। লিস্টের উপরের দিকে কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম থাকত, যেগুলো বাস্তবেই ‘জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠান’ ছিল। কিন্তু নিচের নামগুলো নির্ধারিত হতো সম্পূর্ণ ধান্দাবাজির ভিত্তিতে। মানে শাহবাগ আন্দোলনের মুখ বলে যারা পরিচিত ছিল, তাদের কাছে এই লিস্ট ছিল বড় এক ধান্ধার উপায়।
তারা বিভিন্ন বড় ব্যবসায়ীকে ভয় দেখাত। বলত, ‘শাহবাগে বিরিয়ানি, পানি ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে’। এমনকি তাদের ব্যক্তিগত বা নির্দিষ্ট ব্যাংক একাউন্টেও নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পাঠাতে বলা হতো। এভাবেই ‘৭১-এর চেতনা’-কে পুঁজি করে ভালোই কামাই-রোজগারের ব্যবস্থা তখন একদল ‘চেতনাবাজ’ করে ফেলেছিল।
২০২৪: একাল-সেকালের মিল ও অমিল
আপনি যদি মনে করেন, এই দেশে শাহবাগের ঘটনা একবারই ঘটেছে এবং তা কেবল ইতিহাস, তাহলে আপনি বড় ভুল ধারণার মধ্যে আছেন। সম্পূর্ণ আগের স্টাইলেই ২০২৪ সালের পরেও আরেকবার শাহবাগে আন্দোলন হয়েছিল। আগের শাহবাগ কোনো নিয়ম-নীতি বা বিচার চায়নি, শুধু বলেছিল, ‘ঝুলিয়ে দাও’। পরের শাহবাগও কোনো বিচার-আচার চায়নি, বলেছে, ‘একটা দলকে নিষিদ্ধ কর’।
চেতনা ব্যবসার শুধু সালটা বদলেছে। আগেরটা ছিল ৭১, আর পরেরটা ২৪। এখন কথা হলো, আপনি কি মনে করেন, ৭১-এর চেতনা ব্যবসায়ীদের মতো ২৪-এর চেতনা ব্যবসায়ীরা কোনো ধান্ধা করেনি?
যদি তাদের এত নিষ্পাপ মনে করেন, তাহলে সময় পেলে আমি প্রমাণগুলো দেখাব ইনশাআল্লাহ্। প্রমাণগুলো দেখলে বুঝবেন যে, ২৪-এর ‘যোদ্ধা’ পরিচয়ে একদলের অসংখ্য চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে।
নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি এবং জমিদারের নাতি
আগের শাহবাগ যেমন বয়কটের জন্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের তালিকা করেছিল, সেইম তালিকা এবারও একদল চেতনা ব্যবসায়ী করেছে। তালিকা করে তারা অবশ্য বয়কটের ডাক দেয়নি। দিয়েছে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি।
কীভাবে?
যেমন মনে করেন, একটা বড় ব্যবসায়ীর কাছে গিয়ে বলল, ‘আপনারা আগে যা করেছেন। আমাদের কিছু দেন। আপনার আর নিরাপত্তা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না’।
এভাবেই কিছু দলের রাজনৈতিক কার্যালয় বা দল চালানোর খরচ উঠে এসেছে। যারা টাকার অভাবে হলের ডালভাত খেত, তারা রাতারাতি হয়ে গেছে ‘জমিদারের নাতি’। তাদের হাতে যেন আলাদিনের চেরাগ এসে গেছে। অসংখ্যবার ওমরাহ এবং বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ানো তাদের জন্য কোনো সমস্যাই হয়নি, কারণ টাকার অভাব ছিল না।
মূলত, ‘চেতনা ব্যবসা’ একাল এবং সেকালের মধ্যে শুধু প্রেক্ষাপট ও সালের বদল হয়েছে। ধান্দাবাজি ও চাঁদাবাজির রূপ বদলালেও তার মূল চরিত্রটি একই রয়ে গেছে। ইতিহাস বারবার ফিরে ফিরে আসে।