আব্বুর প্রতি আমার কষ্টটা কম না। প্রতিটা সন্তান দিনের একটা সময় তার মা-বাবাকে কাছে পায়। আমি পাইনি। আম্মুকে যাও কিছুটা পেয়েছি, আব্বুকে কাছে পাইনি বললেই চলে।
দিন নাই, রাত নাই, প্রতিষ্ঠান খোলা নাই, বন্ধ নাই, এমন কোনো সময় নাই বোধহয়, যেই সময়টা আব্বু একটু ফ্রি কাটাতে পারেন বা কাটাতেন।
একটা সময় কষ্ট পেতাম। রাগ করতাম। কিন্তু এখন নিয়তি হিসেবেই মেনে নিছি সব। বিদেশেও তো অনেক মানুষ থাকে। তারা তো বছরের পর বছর ফ্যামিলি থেকে দূরে থাকে। অনুযোগ করলেই আব্বু বলতেন সে কথা।
আসলে যে কাজের চাপ আব্বুর উপর বা যেভাবে সব কাজ তিনি নিজে তদারকি করেন, ফ্রি সময় পাওয়া আসলেই তার জন্য খুব কঠিন। অথচ এই ব্যস্ততাটাও কেমন যেন ম্যানেজ করে ফেলেন মাঝেমাঝে। মহল্লার সাথীদের নিয়ে চলে যান তাবলীগে। ঢাকা থেকে দূরে, অনেক অনেক দূরে, দেশের সীমানারও খুব কাছাকাছি। আমি তখন কষ্ট পাই না। শুধু দোয়া করি, আল্লাহ্! আব্বুকে তুমি ভালো রেখ। নিরাপদে আমাদের ফিরিয়ে এনো। আমার বুকটা যেন কাপতে থাকে প্রতিটা সময়।
মাঝেমাঝে বাঁধা দিতে মনে চায়। বলতে মনে চায়, এবার একটু রেস্ট নেন। মাদরাসায় এত সময় দেওয়ার দরকার নাই। তাবলীগে তো জীবনে কম গেলেন না। এই বৃদ্ধ বয়সে না গেলে হয় না?
পরে মনে পড়ে, তিনি যে জীবনটা ভালোবাসেন, সে জীবনেই তাকে থাকতে দেওয়া উচিৎ। তাবলীগে তো নতুন যান না।
যেখানে আমি এক চিল্লার কথা ভাবলে নিজের কাছে সেটা অসম্ভব লাগে, সেখানে তিনি এক সাল সময় দিয়েছেন, তাও অসম্ভব এক ভালো রেজাল্টের পরে। পেয়েছেন, উস্তাদদের দোয়া ও প্রশংসা, যেটার কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুতও হয়ে যান।
আব্দুর রশিদ নো’মানী রহিমাহুল্লাহ ছিলেন আব্বুর উস্তাদ। নিউটাউনে ইফতা পড়ার ফতোয়ার একটি কিতাব তিনি তাখরীজ করেছিলেন। আর সেই কিতাবের উপরেই প্রায় অর্ধ পৃষ্ঠা জুড়ে প্রশংসা করে মন্তব্য লিখেছিলেন মাওলানা আব্দুর রশিদ নোমানী রহিমাহুল্লাহ। যার নিচে আব্বুর আরেক উস্তাদ ওলী হাসান টুনকী রহিমাহুল্লাহ আব্বুকে মুমতাজ ছাত্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।

কিন্তু এত ভালো রেজাল্ট করেও আব্বু সরাসরি খেদমতে চলে আসেননি। তিনি নিজের জন্য তাবলীগের কাজটাকে প্রয়োজনীয় মনে করেছিলেন এবং পূর্ণ এক বছর তাবলীগে সময়ও দিয়েছিলেন। অবশ্য দেশে এসেই তিনি খেদমতে যুক্ত হন। আট বছর পড়ানমোহাম্মদপুরে জামিয়া মোহাম্মাদিয়াতে। আব্বু অবশ্য এটাকে বলেন সিরাজদ্দৌলা সাহেবের মাদ্রাসা।
ক্বারী ইব্রাহীম সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহির নাতি হওয়া এবং আমলের কারণে আব্বু ছিলেন পাহারপুড়ি হুজুর রহমতুল্লাহি ইলাইহির অনেক প্রিয়। জামিয়া মোহাম্মাদিয়াতে তিনি আব্বুকে দাওরা জামাতের দারুল ইকামার দায়িত্বও দিয়েছিলেন, আব্বু যে দায়িত্বের জন্য নিজেকে উপযুক্ত মনে করেননি। কিন্তু পাহাড়পুরি হুজুরের কথা তিনি ফেলতেও পারেননি। পাহাড়েপুরি হুজুর যখন সেই মাদ্রাসা ছেড়ে চলে আসেন, অনেক উস্তাদের মতো আব্বুও চলে আসেন সেখান থেকে। শুরু করেন এক নতুন জীবন। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা আর তাবলীগের যে জীবন আব্বুকে আমাদের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়েছে। অথচ জামিয়া মোহাম্মাদিয়াতে পড়ানোর সময়, যখন পাশাপাশি তিনি আরব ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থার বড় দায়িত্বেও ছিলেন, ঠিকই আমাদের সময় দিতে পারতেন।
সময় দেওয়া আব্বুর সাথে তাই সারা জীবনই একটা টানাপোড়েন ছিল। তবে এই কষ্ট অনেকটা কমে গেল আমাদের হাতে মোবাইল আসার পরে। সারাদিন আমাকে কেউ কল দেক বা না দেক, আমি জানি রাতে আব্বু কল দিবে।
আমার কী খবর? আমার আহলিয়া বা মেয়েদের কী অবস্থা? দেশের খবর কী? আর যেদিন বাসায় থাকেন, যত রাতই হোক না কেন, আব্বুর অপেক্ষায় আমরা জেগে থাকি। আব্বু আমার মেয়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেন। দাদার যে হাতের স্পর্শ আমরা পাইনি বলে আমাদের আক্ষেপ সারা জীবনের। আমাদের জন্মের আগেই দাদাজান দুনিয়া ছেড়ে বিদায় নিয়েছিলেন।
দাদাজান ছিলেন উজানী মাদ্রাসার প্রথম নাযেম। ক্বারী ইব্রাহীম সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহ তার ছেলেদের মধ্যে তাকেই এই কাজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করেছিলেন। বড় আব্বার জীবদ্দশায় এবং তার ইন্তেকালের পরে দীর্ঘ ৩০ বছর তিনি উজানী মাদ্রাসার খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন।

কেন আব্বুর এত পরিচয় দিচ্ছি জানেন?
দিচ্ছি একটা মেসেজ গ্রুপ আর ফোন কলের কারণে।
তার আগে একটু নিজের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বলি। আমি কখনোই বিএনপির প্রতি নিজের টান অস্বীকার করিনি।
কেন? কারণ, আমার রাজনীতির প্রতি আগ্রহই জন্মেছে জিয়াউর রহমানের কারণে। আলেমদের বইয়ে যেমন তার সম্পর্কে প্রশংসামূলক মন্তব্য পড়েছি। পড়েছি ইতিহাসবিদ এবং গল্পকারদের বইয়েও। মুরব্বিদের মুখেও নিজ কানে শুনেছি, তাকে নিয়ে অনেক প্রশংসার কথা।
তারপর যেহেতু ছোটবেলা কেটেছে মোহাম্মদপুরসহ কিছু ভয়ংকর এলাকায়, সন তরাস কাকে বলে এবং কী হতে পারে, সেটা নিজের চোখে দেখার অভিজ্ঞতা আমার ছিল। আমি চার বছর বয়সে আমপারা শেষ করেছি। কোনো জিনিস আমি সহজে ভুলি না।
তারপর ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায়। অপারেশন ক্লিনহার্ট হল। র্যাব নামল। অশান্তির ঢাকা যেন নিমিষেই ঠান্ডা হয়ে গেল। আমার ছোটবেলার সেই ঘটনা আর দ্বিতীয় বার ঘটল না, যেখানে সন তরাসিদের থামাতে পুলিশের ছোড়া টিয়ার গ্যাসে আমার দম প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
সেই সাথে মধ্যমপন্থা অর্থাৎ ডান-বাম সবাইকে নিয়ে, সব জাতের, সব ধর্মের সবাইকে নিয়ে দেশটা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, এই থিমটাও আমার কাছে ভালো লাগে।
এবং
বিগত সরকারের আমলে আমাদের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য বিএনপি ছাড়া আমার সামনে কোন উপায়ও ছিল না। দেশ মুক্ত করার জন্যই আমাদের সামনে একটা উপায় ছিল যে, আমাকে বিএনপির সাথে থাকতে হবে।
হ্যা জাশির সাথে থাকা যেত। তারাও ১৪-১৫ সাল পর্যন্ত দেশ মুক্ত করার লড়াইয়ে দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু তাদের তো আমি পছন্দ করি না। অনেক কারণ আছে। বলেছি অনেকবার বিভিন্ন জায়গায়। তবে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করি সেই দিন থেকে যেদিন তাদের একজন লোক আমাকে তাদের দলের পক্ষে দাওয়াত দিতে গিয়ে এই কথা বলেছিল যে, যারা তাদের বিরোধিতা করে তারা আসলে তা কাফের।
এরকম আরো কিছু কারণ আছে যেগুলোর কারণে বিএনপির প্রতি আমার একটা টান ছিল আছে এবং এই টান আমি কখনো অস্বীকার করিনি। তবে এটাও সত্য যে কখনো আমি বিএনপিও করিনি সরাসরি। কারণ আমি যে রকম রাজনীতির স্বপ্ন দেখি, বিএনপির মধ্যেও আমি সেটা পুরোপুরি খুঁজে পাইনি।
তারপর ৫ই আগস্ট এলো।
দেশমুক্ত হলো এবং মুক্ত পরিবেশে আমি নিজেকে দলবিহীন ঘোষণা দিলাম স্ট্যাটাস দিয়ে। দলবিহীন থাকার ঘোষনা শুধু এই কারণে দিয়েছিলাম যে, যেন দেশের জন্য আমি আমার সর্বোচ্চ ভালোটা চাইতে পারি।
কিন্তু দলবিহীন বেশি দিন থাকতে পারলাম না। ধরে, বেঁধে, ঠেলে সবাই আমাকে বিএনপি বানিয়ে দিল। মানে আমাকে বিএনপি প্রমাণ করতে পারলে আমি যেন উনমানুষ হয়ে যাই। আমার মতামতের কোনো দাম থাকে না। আমাকে যেভাবে ইচ্ছা গালি দেওয়া যায়। বিএনপির সাথে নাম আছে এমন যেই আকাম করুক, গালিটা যেন শুধু আমার জন্য বরাদ্দ।
যেমন, মিটফোর্ড এলাকায় ইট দিয়ে…. যে ঘটনা, সে ঘটনার দিন। আমিও জানতাম না, সে দিন কী হয়েছে? ফেসবুকে ঢুকে দেখি অসংখ্য মানুষ আমাকে মেসেজ বা ম্যানশন দিয়েছে। কয়েকজন তো খুব খারাপ ভাষা ব্যবহার করে স্ট্যাটাস পর্যন্ত দিয়ে দিল। একটা আইডি দেখে চেনা চেনা লাগছিল। পরে মেসেঞ্জারে ঢুকে দেখি, সে আমার কাছে ইংরেজি কোর্স করেছিল। যে কোর্সের বিনিময়ে আমি শুধু ভালোবাসা চেয়েছিলাম। বিনিময় সে আমাকে উত্তম প্রতিদানই দিয়েছিল! সেই স্ট্যাটাসে কুটুক্তি করে কমেন্ট করেছিল এমন একজন, যে দাওরায় আমার কাছে হাদিস পড়েছিল। এতটাই ভালো আচরণ আমি পেয়েছিলাম আমি আমার অঙ্গনের সব মানুষ থেকে।
দোষটা কি জানেন আমার?
আমি পাঁচ বছরের পক্ষ নই। আমি বলেছি যে, ইউনুসের উচিত দ্রুত নির্বাচন দিয়ে সরে যাওয়া।
আমি ইউনুসকে কখনো মন থেকে মানতে পারিনি। আমি বুঝেছিলাম যে, সে ইমারজেন্সি পরিস্থিতির জন্য ঠিক আছে। কিন্তু আমার মনে ছোটবেলা সেই পত্রিকার খবরগুলোও ছিল, যেখানে দেখেছিলাম যে তার গ্রামীণ ব্যাংকের লোকেরা সুদের টাকা না পেয়ে মানুষের টিনের চাল কিংবা মুরগি ধরে নিয়ে এসেছে। আজকে যারা পাঁচ বছর চাই বলে নেচেছে, তাদের বাপ দাদারাই তো আমার মনে ইউনুস সম্পর্কে খারাপ ধারণার বীজ তৈরি করেছে। বুঝিয়েছে, সে নোবেলটা আসলে ঐ জন্য পেয়েছে।
তার উপর যখন দেখলাম, তার কথার সাথে কাজের মিল নেই। নিজের স্বার্থ দেখেই সে সব কাজ করে যায়। শুধুমাত্র নিজের পছন্দের মানুষ বলে একজন ব্যাংকারকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বানায় এবং ভাতিজাকে উপ-প্রেস সচিব বানায়, গ্রামীণ গ্রুপের সুবিধায় কাজ করে ও কর মওকুফ করে দেয়, এক দল মানুষের দাবি ছিল, তখনও যেন আমি চুপ করে থাকি। ওরা যেভাবে উনাকে নিষ্কলুষ দেখে, আমাকে সেভাবেই বলতে হবে, আমাকে সেভাবেই লিখতে হবে।
মানলাম না। ওরা আমাকে বিএনপি বানাতে চায়, হলাম বিএনপি। ওরা আমাকেপা গল বানাতে চায়, হলামপা গল। সমস্যা কী? ওদের চোখে তো আর আমার ভালো হওয়ার প্রয়োজন নেই। এমন নেতাদেরকে শ্রদ্ধা করার দরকার নেই, যার কর্মীরা খুব অমায়িক ভাষার (!) শিক্ষা পেয়ে থাকে।
এভাবেই চলে গেল প্রায় দুই বছর এবং এই জগত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। হ্যাঁ, শুধু একটা হিসাব বাকি ছিল। নির্বাচন হয়ে গেলেও একটি দলের কারণে, একজন নেতার কারণে কওমী অঙ্গনের সুদৃঢ় দুর্গ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল বলে মনে করেছিলাম।
তাই সেই দলের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করতে চেয়েছিলাম। আমি কোন মিথ্যা লিখিনি বা অশালীন ভাষাও ব্যবহার করিনি। যা লিখেছি সব প্রমান সহ। এটা সত্য যে মাঝে মাঝে হাস্যরসের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে তুলে ধরতে চেয়েছি। যেটা মানুষের কাছে খুব সহজে পৌছায় এবং মানুষ খুব সহজে মেসেজটা ধরতে পারে।
আবার এটাও সত্য যে আমি সেই দলের নেতার নামটা সম্মানের সাথে উচ্চারণ করিনি। এটা ওদের পছন্দ, ওদের কাজ। কিন্তু আমি যেহেতু তাদের দলের না। তাই আমি উচ্চারণ করেছি ঠিক সেভাবে যেভাবে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম উচ্চারণ করা হয়। কিন্তু ওদের ভক্ত সমর্থকরা এটা মানতে পারল না।
গালি দিয়ে ওদের মন ভরল না। ওরা নামল এমন এক কাজে, রাজনীতির মাঠে যেটাকে সবচেয়ে জঘন্য কাজ বলে মনে করা হয়।
একটা মেসেজ গ্রুপের খবর আমার কাছে আসে। আমার লেখালেখি থামিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নিজের পড়াশোনার জন্য যেটা আমি নিজে নিজেই থামিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম।
ওরা আমাকে বলতে পারতো থামতে। বলতে পারত, ভাই, আর লেইখো না। তোমার যুক্তি-প্রমাণের সামনে আমরা টিকতে পারছি না।
কিন্তু ওরা নিজেরা ভুল পথ থেকে ফিরল না এবং আমাকে থামানোর জন্য সঠিক পদ্ধতি অর্থাৎ দলিল প্রমাণের রাস্তাতে হাঁটল না। পরে চিন্তা করল আমাকে থামাবে আমার পরিবার দিয়ে। আমার পরিবারের নামে আজেবাজে কথা রটিয়ে দিয়ে।
ওদের দলের দায়িত্বশীল দুইজন সেম টাইমে আমার পরিবার নিয়ে বাজে বাজে কথা লেখলো। (আদালতে উপস্থাপনের মতো যে স্ট্যাটাস ও কমেন্টের প্রমাণ সংরক্ষণ করা হয়েছে।) আমার পিতাকে নিয়ে স্ট্যাটাসে খারাপ কথা লিখল। স্ট্যাটাসে আমার নাম নেয়নি। কিন্তু কমেন্ট বক্সে ঠিকই সবাই আমার নাম নিল এবং স্ট্যাটাস দাতা বলল যে আপনাকে নাম নিতে কে বলেছে? যে কমেন্ট দিয়ে সবাই ধরে নিল যে, আমার বাপ খারাপ। রাজনৈতিক যুক্তি পরাজিত হয়ে ওরা বেছে নিল এমন এক জঘ ন্যপন্থা।
ওদের এমন নিচুতা দেখে আমি ভয় পাইনি। আমি দেখতে চেয়েছিলাম, ওর আর কতটা নিচে নামতে পারে। আমিও প্রস্তুত করছিলাম এমন সব প্রমাণ, যেগুলো ওদের মুখোশ সবার সামনে খুলে দিবে।
কিন্তু আব্বুর একটা কল আমার সব এলোমেলো করে দিল।
কেউ একজন আব্বুকে ফোন দিয়েছে এবং তিনি আমার কথা চিন্তা করে প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেছেন।
তোমাকে কতদিন না বলেছি কারো বিরুদ্ধে না লিখতে?
নির্বাচনের পরে না রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল?
বই লেখার কথা ছিল, বই কোথায়?
আল্লাহর ওয়াস্তে এসব ছাড়।
কারো বিরুদ্ধে কখনো কিছু লেখবা না।
যা লিখেছ, সব মুছো।
আব্বু তিন দিনের জন্য মৌলভীবাজার আসামের সীমান্ত এলাকায় তাবলীগে গিয়েছেন। সেখান থেকে দিরেই ফোনটা পেয়েছেন তিনি। তখনো তিনি ঢাকায় না। ফোনে বললেন, আমার জন্য সেখানে কতটা দোয়া করছেন। আমাকে কতটা মায়া করেন তিনি।
প্রথমে অনেকগুলো বকা দিয়ে নিজেই মনে করলেন যে বেশি হয়ে গেছে। কারণ আমি শুধু শুনে যাচ্ছিলাম। কোনো কথার উত্তর দিচ্ছিলাম না।
আসলে আব্বুর আদেশে দুইটা অংশ ছিল।
লেখা মুছে দেওয়া আর সামনে কারো বিরুদ্ধে না লেখা।
সামনে কারো বিরুদ্ধে না লেখাটা সহজ। কে কী করছে না করছে দেখে নিজের কাজে শুধু ডুবে থাকতে হবে।
কিন্তু লেখা মুছা?
লেখা মুছে ফেলা মানে তো নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে ভুল প্রমাণ করা। লেখা মুছে ফেলা সম্ভব না। আবার ওদের খারাপি দেখে নিজেকে কন্ট্রোলও করা সম্ভব না। তাই আইডি ডিএক্টিভ করেছিলাম।
এখন আবার একজন বলছে, আমি নাকি ভয় পেয়েছি।
কেউ যদি সত্য বর্ণনা করে তাহলে এমন কোন কিছু নেই যেটাতে আমাকে লজ্জিত হতে হবে।
আর কেউ যদি মিথ্যা বর্ণনা করে, তাহলে তাদেরই ভয় এবং লজ্জা পাওয়া উচিত।
আমি আমার পরিবার নিয়ে, আমার বংশ নিয়ে কখনো গর্ব করতে চাইনি। অথচ আমার বাবা-মা, দাদা, নানা- প্রত্যেকের পরিচয় নিয়ে গর্ব করা যায়।
মানুষের গর্ব করা বা লজ্জিত হওয়া উচিৎ নিজের কারণে। ফ্যামিলির অবস্থান নিয়ে মনে আনন্দ থাকতে পারে। গর্ব নয়। যে আনন্দ আমার মনে পরিপূর্ণভাবে আছে।
আমার দাওরা বছরের সবচেয়ে প্রিয় উস্তাদ (বুখারীর) একদিন আমাকে একটা কথা বলেছিলেন।
“তোমার বাবার মত লেনদেন পরিষ্কার এমন মানুষ আমি কখনো দেখিনি।”
একজন সন্তানের জন্য এই কথা শোনার চেয়ে আনন্দের বিষয় আর কী হতে পারে?
(২০/৫/২০২৬)